ছ’ মিনিটে সাদাত হাসান মান্টো

Sudarshana Chakraborty

Sudarshana Chakraborty

click here

সাদাত হাসান মান্টো – সাহিত্যের, না, বলা ভালো শিল্পের রাগী যুবক। সাদাত হাসান মান্টো নামটা বললেই শিরায়-উপশিরায় এক অস্থির স্রোত বইতে থাকে, যা আমাদের শান্ত-নিরিবিলি জীবনের সঙ্গে কিছুতেই মেলে না, যাঁর লেখাগুলো আমাদের উত্তেজিত করে, আমাদের প্রশ্ন তোলার কথা মনে করিয়ে দেয়। ছ’মিনিটের ছোট্ট পরিসরে এমন কী করা যায়, যাতে সেই তাঁকে ঘিরে আবার ‘অ্যাড্রিনালিন রাশ’ তৈরি হয়, আবার ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে মান্টো-কে, তাঁর জীবনকে, চিন্তাকে, তাঁর লেখা গল্প আর চরিত্রদের?

মান্টো-র গল্প বা চরিত্ররা শুধু নয়, তিনি নিজেই যখন নাটক বা সিনেমার মতো কোনও শিল্পমাধ্যমের চরিত্র হয়ে উঠেছেন, তাঁর সৃষ্টি আর তিনি নিজে যখন অবিচ্ছেদ্য হয়ে ধরা পড়েছেন, সেই কাজটি নিয়ে বরাবরই সাড়া পড়ে গেছে। আর তাই এক বছর আগে যখন অভিনেত্রী, পরিচালক নন্দিতা দাস ঘোষণা করেন তিনি মান্টো-কে নিয়ে একটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সিনেমা তৈরি করতে চলেছেন তখন তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। তারপর যখন তিনি জানান প্রধান চরিত্রে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকিকে নির্বাচন করেছেন তখন ইতিমধ্যেই নানারকম চরিত্র করে নজর টানা নওয়াজ মান্টো-র মতো গভীর, অস্থির, সাহসী শিল্পী চরিত্রকে কিভাবে পর্দায় নিয়ে আসেন তা দেখার কৌতুহল তৈরি হয়। সেইসঙ্গে ফিরাক-এর মতো সিনেমা পরিচালনার আট বছর পর আবার পরিচালনায় ফিরে নন্দিতা কীভাবে আজকের ভারতবর্ষে দাঁড়িয়ে মান্টো-র পুনর্পাঠ করছেন, তাঁর যাপন, ভাবনা, লেখার প্রক্রিয়াকে পর্দায় নিয়ে আসছেন তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়।

নন্দিতার পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সিনেমাটি এই লেখার বিষয় নয়। বিষয়, নওয়াজকে মান্টো-র চরিত্রে রেখে মাসখানেক আগে ইউ টিউবে মুক্তি পাওয়া নন্দিতার ছ’মিনিটের শর্ট ফিল্ম ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’। এক বছর ধরে যেখানে ফিচার ফিল্মটির চরিত্র নির্বাচন, প্রস্তুতি, শ্যুটিং ইত্যাদি চলছে, মাঝেমাঝে ‘খবর’ হচ্ছে, সেখানে এই শর্ট ফিল্মটি রিলিজ করে নন্দিতা পরিচালক হিসাবে বিচক্ষণতার পরিচয় দিলেন। না, এটি তাঁর ফিচার ফিল্ম-এর ট্রেলার নয়। একটি স্বাধীন স্বল্প দৈর্ঘ্যের সিনেমা, যা অবশ্যই ঐ পূর্ণ দৈর্ঘ্যের সিনেমাটির তার বেঁধে দেয়। শর্ট ফিল্ম-এর ক্রমশ বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’ তৈরি করে নন্দিতা প্রমান করলেন মান্টো-কে নিয়ে সিনেমা পরিচালনায় নেমে তিনি কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চান না। দর্শক, সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া আগে থেকেই বুঝে নেওয়ার জন্য এর থেকে ভালো উপায় আর হত না। ত্রিশ সেকেন্ডের ট্রেলার না কি ছ’মিনিটের শর্ট ফিল্ম দর্শকদের মস্তিষ্কে ছাপ ফেলার জন্য কোনটা বেশি কার্যকর, সে তর্কে না ঢুকেও বলা যায়, মান্টো-কে নিয়ে তাঁর সিনেমার প্রকল্পটিকে ঘিরে আলোচনা যাতে কোনওভাবেই থেমে না থাকে, তা নিশ্চিত করার জন্য এই শর্ট ফিল্মটিকে পরিচালক নন্দিতা দারুণভাবে ব্যবহার করলেন। দর্শকদের সঙ্গে নিয়ে শুরু হল মান্টো-র সঙ্গে নন্দিতার সিনেম্যাটিক জার্নি।

আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে সিনেমা ক্রমশ এমন একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে যেখানে পরিচালকদের আরও বেশি করে দর্শকদের আকৃষ্ট করার, নিজেদের সিনেমাকে ঘিরে আগ্রহ-উত্তেজনা তৈরি করার পদ্ধতিগুলো বদলে যাচ্ছে, তাই মূলধারা বা সমান্তরাল – সিনেমাটি যে ধরনেরই হোক না কেন, প্রযোজক, পরিচালকদের এমন একটি স্ট্র্যাটেজি বা পন্থা বেছে নিতেই হয় যা তাকে অন্যদের থেকে অন্তত কয়েক কদম এগিয়ে রাখতে পারে। আর একে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি হিসাবে স্বীকার করার মধ্যে শিল্পীসত্ত্বার বা শিল্প মাধ্যমের কোনও বিবাদও নেই। শেষ পর্যন্ত দর্শক হোক বা পুরস্কার, ক্রিটিকাল অ্যাপ্রিশিয়েশন বা লগ্নী টাকার ফেরত সবই ভাবনার মধ্যে থাকে।

গত বছর দুয়েক ধরে শর্ট ফিল্ম ভারতের বাজারে নতুন করে ফিরে এসেছে। ডিজিটাল মিডিয়া যত বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে তত বেশি করে শিল্পমাধ্যমের নতুন, পুরনো ফর্ম নিয়েও চিন্তা-ভাবনা বাড়ছে। আর এই ক্ষেত্রেই শর্ট ফিল্ম তার জনপ্রিয়তা আবার ফিরে পেয়েছে ইউটিউব ও আরও অন্যান্য ডিজিটাল মিডিয়ার দৌলতে। ফিচার ছবি করার বড় বাজেট, শ্যুটিং শিডিউল বাদ দিয়ে অনেক কম টাকায় ছোট ছবি তৈরি করে পরিচালকরা জনপ্রিয়তা আর লাভ দুইয়েরই মুখ দেখছেন। সেই শর্ট ফিল্ম-এর জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েই নন্দিতা ত্রিশ সেকেন্ডের দৃশ্যের কোলাজ নয়, নতুন ফিচার ছবির আভাস দিয়ে রাখলেন ছ’ মিনিটের ছোট ছবিতে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, রাধিকা আপ্তে থেকে মনোজ বাজপেয়ী, রবীনা ট্যান্ডন সবাই ইতিমধ্যেই শর্ট ফিল্মে অভিনয় করেছেন এবং সেগুলি ‘সুপারহিট’।

ইতিমধ্যেই ভিউজ আর লাইক-এর সংখ্যা যতয় পৌঁছেছে তাতে এই শর্ট ফিল্মটিকেও হিট আখ্যা দেওয়া যায় আর এটুকুও বোঝা যায় ফিচার ছবিটির ‘বক্স-অফিস’ ভাগ্য যাই হোক না কেন, তা দেখার জন্য প্রাথমিকভাবে দর্শক হলমুখী হবেন। নন্দিতার আগের সিনেমা ‘ফিরাক’-এর কথা মাথায় রেখে বলা যায় এক শ্রেণীর দর্শকের কাছে এবং চলচ্চিত্র উৎসব ও পুরষ্কার মঞ্চে মান্টো’ সমাদৃত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, কিন্তু ব্যবসায়িক দিক থেকে তা কতটা লাভজনক হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। অবশ্যই এখন প্রযোজকের লগ্নী টাকা ফেরত পাওয়ার অনেক উপায় রয়েছে, যেমন টেলিভিশন স্বত্ত্ব বিক্রি, ডিজিটাল মিডিয়ার ব্যবহার, বিদেশে মুক্তি ইত্যাদি। শর্ট ফিল্মটি তৈরি ও ইউ টিউব রিলিজ করে এভাবেই শুধু পরিচালক হিসাবে সময়োপযোগী সমান্তরাল সিনেমা তৈরির দায়বদ্ধতা নয়, সিনেমার ব্যবসায়িক দিকেও যে তাঁর নজর রয়েছে তাই প্রমাণ করলেন নন্দিতা। সেইসঙ্গে ফিচার সিনেমাটির প্রচারের কাজও এগিয়ে রইল অনেকটাই।

পরিচালক হিসাবে নন্দিতা দাসের কাছেও দর্শকদের প্রত্যাশা অনেক। তিনি সমসময়ের রাজনীতি, সমাজকে সিনেমায় যেভাবে তুলে ধরেন তা ইতিমধ্যেই দর্শক, সমালোচক প্রশংসিত। তাই মান্টো-কে নিয়ে যখন তিনি সিনেমা তৈরির কথা ভেবেছেন তখন থেকেই তাঁর উপরে সেই প্রত্যাশার চাপ এসে পড়েছে। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে যখন ধর্ম, জাত, শ্রেণী, বর্ণে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র যেখানে টুঁটি চেপে ধরছে, লিঙ্গবৈষম্যের নামে বেড়েই চলেছে হিংসা আর অবমাননা, ক্ষমতার হাত শক্ত করছে লোভী চাটুকারেরা, সেখানে দাঁড়িয়ে সাদাত হাসান মান্টো-র মতো করে ভাবতে পারা, বলতে পারা ভীষণ জরুরি। আর তার চেয়েও জরুরি তাঁকে ফিরিয়ে আনা, তাঁর চরিত্রকে, তাঁর মাথার ভেতর খেলতে থাকা শব্দগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটানো। কারণ মান্টো ঘুরতে থাকা সময়ের কাঁটার মতোই অনিবার্য আর সমসাময়িক। বিতর্ক? না। শুধু বিতর্ক শব্দটা দিয়ে সাদাত হাসান মান্টো-কে ব্যাখ্যা করা যায় না। মান্টো-র লেখা, তাঁর চরিত্ররা, তাঁর দেখা, তাঁর ভাবনা – তা শ্লীল, অশ্লীলের সীমারেখা পেরিয়ে গেছে না কি, অশ্লীলতা বলতে আমরা ঠিক কি বুঝি – এইসব নিয়ে তাঁর সময় থেকে আজ পর্যন্ত যত আলোচনা হয়েছে তা সম্ভবত খুব কম সংখ্যক লেখক, শিল্পীর ক্ষেত্রেই ঘটেছে। আর তা যদি নাই হল, তাহলে আর শিল্পসৃষ্টির সার্থকতা কোথায়! মান্টো তাই আজ, হয়তো আরও বেশি, প্রাসঙ্গিক।

ফিরে আসা যাক, ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’ প্রসঙ্গে। সিনেমাটির নামকরণেই রয়েছে শিল্প ও শিল্পীর স্বাধীনতা আর মানুষের স্বতঃসিদ্ধ বাক্‌স্বাধীনতার বিষয়টি। ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’ নামটি এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেন্সরশিপ আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের মতো বিষয়টিকে সরাসরি সামনে নিয়ে আসে। তাহলে কি এই স্বাধীনতা বাঁচিয়ে রাখতে আবার নতুন করে মান্টো-কেই পড়তে হবে, লড়াইটা তাঁর মতো করেই করতে হবে? প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর নড়াচড়া করতে শুরু করে।

এই শর্ট ফিল্ম-এ মান্টো-র চরিত্রে নওয়াজউদ্দীন স্পষ্টবক্তা, উদ্ধত, রাগী, বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এক লেখক যার দিকে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রয়েছে তরুণ প্রজন্ম, যে বিতর্ক-সমালোচনার মাঝেও নিজের চিন্তা ও বক্তব্যে অনড়, চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসী। ঠিক যেরকমটা না হলে লেখা যায়না খোল দো, ঠান্ডা গোস্ত, কালি সালওয়ার …। কলেজের ক্লাসরুমে মান্টো পড়ুয়াদের সামনে কথা বলছেন তাঁর লেখা, তাঁর ভাবনা, তাঁর শব্দের ব্যবহার নিয়ে। সমাজ, সমালোচকরা তাঁকে কীভাবে দেখে তাই নিয়ে। আর কেন তিনিই ঠিক, দেখার চোখটাই আসলে ভুল তা নিয়ে তাঁর ক্ষুরধার মন্তব্য ঐ পড়ুয়াদের মতোই দর্শকদেরও টানটান উত্তেজনায় বসিয়ে রাখে। খুব বুদ্ধিদীপ্তভাবেই নন্দিতা এই শর্ট ফিল্মটিতে ঠিক সেই কথাগুলিই মান্টো-র সংলাপ হিসাবে ব্যবহার করেছেন যা দর্শকদের নজর ও মনোযোগ টেনে রাখতে পারে ও পরবর্তী সিনেমাটির জন্য কৌতুহল তৈরি করে। বেশ্যাদের নিয়ে কেন তিনি লিখবেন না, কেন অশালীন হিসাবে সমাজ যে ভাষাকে দেগে দিচ্ছে তা শিল্পীর স্বাধীনতা ও বাক্‌স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আর বাস্তবকেও অস্বীকার করা, কেন লেখকের এক ও একমাত্র কাজ সমাজকে তিনি চোখের সামনে যেভাবে দেখতে পাচ্ছেন সেভাবেই তুলে আনা কাঁচকাটা স্বচ্ছতায়, কেন তাঁকে পড়ার জন্য, এমনকি তাঁকে প্রশ্ন করার জন্যও মুক্তচিন্তা বড় বেশি প্রয়োজন – এই সবটুকুই পরিচালক শর্ট ফিল্মটিতে মান্টো-কে দিয়ে বলিয়ে তাঁর সমসাময়িকতাকে আরও বেশি যুক্তিসঙ্গত করে তুলেছেন।

কলেজের ক্লাসরুমকে প্রেক্ষাপট হিসাবে বেছে নেওয়াটাও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে লক্ষ্য করলে দেখা যায় শুধু ছাত্রছাত্ররাই নয়, রয়েছেন মাঝবয়সী বা সাদা চুলের অধ্যাপকেরাও। যাঁরা দৃশ্যতই মান্টো-র কথা শুনে বিব্রত, উঠে বেরিয়েও যান কেউ। ছাত্রছাত্রীদের সামনে রাখার উদ্দেশ্য, তারাই তো আগামী দিনে প্রশ্ন তুলবে। তাদের মন ও মস্তিষ্ক যেন শেষ দৃশ্যের কালো ব্ল্যাকবোর্ড, যেখানে মান্টো-র মতো কেউ কখনও আঁচড় কেটে যায়। তাদের অভিব্যক্তিতে ধরা পড়ে অনেক রকমের অনুভূতি, প্রশ্ন, যার উত্তর তারা খুঁজে নেওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে।

অবশ্য শর্ট ফিল্মটি যে এর যাবতীয় শর্ত পূরণ করতে পেরেছে তা নয়। কারণ গল্পটির কোনও উত্তরণ ঘটেনি। নিছকই ক্লাসরুমে মান্টো-র বক্তব্য পেশের মধ্যেই আটকে থাকে। পুরোটিই সংলাপধর্মী। আর সেখানে শুধুই মান্টো কথা বলে চলেন। শুরু হয় সমালোচকরা মান্টো-কে কে কি বলেন তাই দিয়ে, কিছুক্ষণ পরে তিনি নিজেই বলেন, মান্টো একজন মানুষ আর সব মানুষেরই উচিৎ প্রগ্রেসিভ হওয়া। ঐ একবারই মান্টো নামটি আসে। আচ্ছা কেউ যদি না জানেন, চরিত্রটি কে তাহলে সে কিভাবে এই শর্ট ফিল্মটির বুঝবেন। অর্থাৎ পরিচালক ধরেই নিচ্ছেন দর্শকরা মান্টো-র প্রেক্ষিত জেনে, তাঁর পরবর্তী সিনেমাটিকে মাথায় রেখেই এই শর্ট ফিল্মটি দেখবেন। স্বাধীন স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবির ক্ষেত্রে যা ঠিক প্রযোজ্য নয়। এটি যেন নিছকই কিছু হাততালি পাওয়ার মতো সংলাপ খুবই নায়কোচিত কায়দায় বলে যাওয়া। টুকরো টুকরোভাবে উঠে আসে মান্টো-র লেখকজীবনের ছবি, যেমন তাঁর লেখা নিয়ে প্রায়শই অশ্লীলতার দায়ে মামলা হওয়া, তাঁর বিষয় ও ভাষা নিয়ে বিতর্ক ইত্যাদি।  ক্লোজ শট, মিড ক্লোজ আপ আর খুবই কম লং শট-এ দৃশ্য তৈরি হয়। সম্পূর্ণ ফোকাস মান্টো চরিত্রটির উপরে। সেখানে বাকিরা নেহাত পার্শ্বচরিত্র। মুখ্যচরিত্রটি একক অভিনয়ে স্বগতোক্তির মতোও এই কথাগুলি বলতে পারতেন। এই শর্ট ফিল্মটিকে আলাদা করে দেখতে বসলে কী, কেন-র কোনও উত্তর পাওয়া যাবে না। যদি না ফিচার ফিল্মটি সম্পর্কে জানা থাকে। আর যদি সেটি না বানাতেন, তাহলে কি এখন এই স্টাইলে মান্টো-র উপর শর্ট ফিল্ম নন্দিতা বানাতেন? যদিও শর্ট ফিল্ম তবু শেষে ঠিক যেন ফিচার ফিল্ম-এর ট্রেলার-এর মতোই একটি প্রশ্ন রেখে দেয় এ ছবি, যা ফিচার সিনেমাটির জন্য অপেক্ষাকে আরও কৌতুহলী করে তোলে। কাজেই একে যথাযথ শর্ট ফিল্ম বলা যায় কি না সে প্রশ্ন উঠবেই।

ছবিটির শেষ পর্যায়ে মান্টো বলেন, এই নগ্ন সমাজকে তিনি আর কীভাবেই বা নগ্ন করবেন, কিন্তু তাকে কাপড় পরানোর দায়িত্বও তাঁর নয়; তাঁর লেখা আয়নার মতো, সমাজ যদি কুৎসিত দর্শন হয়ে গিয়ে সেই আয়না দেখতে না চায় তাহলে বুঝতে হবে সমাজটাই থাকার উপযুক্ত নয়। তিনি কালো প্রেক্ষাপটে সাদা দিয়ে আঁচড় কাটেন যাতে তা কতটা নিকষ কালো তা আরও বোঝা যায়। ভাবতে থাকেন, “আমি নিজের চোখ যদি বন্ধ করেও নিই, নিজের বিবেক নিয়ে কি করব!” এই ভাবতে ভাবতেই অস্থির, রেগে ওঠা মান্টো কথা অসমাপ্ত রেখেই সাদা পাঞ্জাবীর হাত গুটিয়ে বেরিয়ে যান, ক্লাইম্যাক্স মিউজিক বাজতে থাকে। ফাঁকা করিডরে হেঁটে চলে যেতে থাকা মান্টো-র প্রেক্ষিতে ভেসে ওঠে “বোল কে লব আজাদ হ্যায় তেরে”। ভাষার স্বাধীনতা, বাক্‌স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে একস্বর থেকে বহুস্বরে পৌঁছানোর আওয়াজ তোলা হয় যেন।

আজকের নিহালনী রাজত্বে, গেরুয়া রঙে ঢাকা পড়তে পড়তে শব্দগুলোর স্বাধীনতা, শিল্পের আওয়াজ তোলার জন্য এই ছোট ছবিটি একেবারে সময় উপযুক্ত। ফিচার সিনেমাটির আগে জমি তৈরি করে নেওয়ার ক্ষেত্রে ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’ এভাবেই বাজার অর্থনীতিকেও আয়ত্তে নিয়ে আসে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ তৈরির জন্য যে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিকেও বশে আনতে হয় বা তাকে ব্যবহারও করতে হয় তার সফল উদাহরণ হতে পারে ‘ইন ডিফেন্স অফ ফ্রিডম’। মান্টো সমসাময়িক সব সময়েই, তবু তার প্রতিবাদের কন্ঠর সঙ্গে বাজার অর্থনীতির কথাও এসময়ে ভাবতে হবে। আর তা করে পরিচালক নন্দিতা ঠিক করলেন না ভুল, সেই তর্কে না গিয়ে বরং বলা যায় তিনি সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে নিজের সিনেমাটিকে প্রচারে রাখলেন। তিনিই প্রথম একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে ফিচার ফিল্ম তৈরির আগে তা নিয়ে শর্ট ফিল্ম তৈরি করে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে গেলেন ডিজিটাল মিডিয়ার মাধ্যমে। ভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রে তা প্রথম। তাছাড়া বছর দুয়েক আগে একই বিষয়ে তৈরি হওয়া পাকিস্তানি সিনেমাটির সঙ্গে তথাকথিত প্রতিযোগীতার বিষয়টি মাথায় রাখলে বলতে হয় নন্দিতা কয়েক পা এগিয়ে গেলেন অভিনবত্বে। এরসঙ্গে পরিচালক হিসাবে শর্ট ফিল্ম তৈরি করলে এই মুহূর্তে তিনি কতটা জনপ্রিয়তা আশা করতে পারেন তাও বুঝতে পারলেন। একইসঙ্গে এতগুলি বিষয় মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়।সিনেমা শিল্পমাধ্যম হিসাবে যতটা জরুরি, দর্শকদের কাছে পৌঁছানোও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর পরিচালক যদি এই দুইকে মেলাতে পারেন তাহলে তা অবশ্যই প্রশংসনীয়।

পুনশ্চ: ক্রেডিট কার্ড ওঠার পর দেখা যায় ‘প্রেজেন্টেশন বাই…” এক মিডিয়া হাউজ-এর নাম। শর্ট ফিল্ম-এর জনপ্রিয়তা, মান্টো-র প্রাসঙ্গিকতা, দর্শকদের কাছে সাফল্য, সব কিছুর পাশে ভেসে ওঠে মিডিয়া হাউজটির নাম। মিডিয়ার স্বাধীনতাও প্রয়োজন বটে, আবার সব কিছুর সমীকরণ কেমন এক মনে হয়। শুধু তার মাঝখানে জেগে থাকে সাদাত হাসান মান্টো।

 

 

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *