ইন্দিরা সিনেমা: ‘একা’ হলের ফিরে আসার গল্প

Team Cinemawallah

Team Cinemawallah

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

সিনেমা প্যারাদিসো-র হলটা শেষ পর্যন্ত বাঁচেনি, ওটা একটা স্মৃতির মধ্যে নস্ট্যালজিয়া হিসেবেই ধেকে গেছে বা ইতিহাসের একটা অংশ। বকুলবাগান-এর ইন্দিরা সিনেমা হল যেন তার উল্টো পথের পথিক, সে শুধু নিজেকে বাঁচিয়েই রাখেনি, বার্ধক্যের চেহারা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে বেঁচে উঠতে চাইছে ফিনিক্সের মতো।

ইন্দিরা সিনেমা হল আবার কি সেটা কোথায়? অনেকেই জানেন না বা অনেকেই ভুলে গেছেন হয়তো তার কথা, হাজরা মোড় থেকে এস্প্ল্যানেড-এর দিকে যেতে ডান হাতে বকুল বাগানের রাস্তায় পড়ত, রাস্তাটার নাম ইন্দ্র রায় রোড। সেখানে ইন্দিরা নামের একটি হল আছে, আজকের ভাষায় যাকে বলে স্ট্যান্ড অ্যালোন হল। এক সময়ের বেশ নাম করা হল এবং এর ইতিহাসও বেশ পুরনো। এক সময় আর ডি বনশল ছিলেন এর মালিক, এবং তাঁর প্রযোজিত সত্যজিৎ রায়-এর সিনেমা মুক্তি পেয়েছে এখানে বলে জানালেন এখনকার মালিকেরা। সত্যজিৎ থেকে উত্তম কুমার সবারই পা পড়েছে এর লবিতে। এমন তাক লাগানো লবি কলকাতার খুব কম সিনেমা হলেরই আছে। লবিতে ঢুকে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। বিশেষ করে এখনকার মালিক বাগারিয়া-রা একে নতুন করে সাজিয়েছেন, ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন আগেকার গৌরব।

এমন জায়গায় রিয়াল এস্টেট মানে তা ব্যসায়িকভাবে অর্থকরী, তাও এই মালিকেরা মানে রাজেন্দ্র বাগারিয়া ও তাঁর স্ত্রী শীতল বাগারিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন স্ক্রিনিং-এর ব্যবসা। বিশেষ করে হলের ম্যানেজার-কাম-মালকীন হিসেবে একজন মহিলা আমাদের এখানে বিরল। এই ধরনের হল চালানো সহজ নয়, ডিস্ট্রিবিঊটর-রা যখন অলিগোপলিস্টিক ভাবে একই সঙ্গে প্রযোজনা ও প্রদর্শনকে নিজেদের কব্জায় আনার চেষ্টা করছে সেখানে এই ধরনের হল মালিকদের সমস্যা তো রয়েছে। সরকারী সাহায্য আরো কিছু পেলে এদের সুরাহা হতে পারে, কিন্তু তাও সহজ নয়। ডিস্ট্রিবিউটরদের চেষ্টাই থাকে বাজে সিনেমা কিছু গছিয়ে দেওয়া যেগুলো তাদের প্রযোজিত ও এমনিতে চলার সুযোগ কম। প্রিমিয়ার দেয় না, এক দু সপ্তাহ পর সিনেমা আনতে হয়। এগুলো বড় সমস্যা। তাছাড়া কমতে থাকা দর্শকের কথাও মাথায় রাখতে হয়।

এর মাঝে ইন্দিরার মতো একটা হল নতুন করে টিঁকে থাকার আশা করছে কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই – মানসিকতার পরিবর্তন। হল মালিকদের মানসিকতার পরিবর্তব ঘটলে এটা অসম্ভব নয়। যেমন শীতল বাগারিয়া বললেন, ‘আমাদের দর্শক নিজস্ব তাঁরা কোনোদিন তিন শ চার শ টাকা দিয়ে যাবে না মাল্টিপ্লেক্স-এ। আর সাধারণ মানুষও বুঝবে ওসব জায়গায় খামোখা তিনগুন টাকা দিয়ে দেখার কোনো মানে নেই, কারণ যা সাউন্ড বা ভিস্যুয়াল সম্ভব ওখানে তা এমনি হলেও সম্ভব।’

এঁরা নির্ভর করছেন একটা বিশেষ জিনিসের উপর – তা হল যে একদিন মানুষ ওই একঘেয়ে মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে যাবে, কারণ সবগুলো একই রকমের দেখতে একই খাবার বিক্রি করে একই রকমের পোশাক পরে কর্মচারীরা, এবং তাতে শিল্পের কোনো ছোঁয়া নেই। এই গর্বটা ইন্দিরার মালিকেরা করতেই পারেন কারণ তাদের বিল্ডিংটি যেমন সুন্দর তেমনি সাজানো। তাছাড়া রয়েছে পুরনো সিনেমার পোস্টারের কালেকশন, যেগুলো রিপ্রিন্ট নয় আসল পোস্টার, সত্যজিতের অসংখ্য ছবির প্রিন্ট থেকে, হিন্দি সিনেমার গোল্ডেন এরার প্রিন্ট।

তবু টিঁকে থাকার লড়াই-এ এরা আরো নতুন কিছু কিছু বন্দোবস্ত করেছেন। যেমন এদের কয়েকটা চমৎকার সেমিনার রুম রয়েছে যেখানে সেমিনার বা অডিশন চলতে পারে স্বচ্ছন্দে – এঁরা সেগুলো ভাড়াও দেন। এঁরা হিন্দি সিনেমার বাইরে পাঞ্জাবী ও গুজরাতি সিনেমা দেখাচ্ছেন কারণ ভবানীপুরে এঁদের সংখ্যা ভালই। গুজরাতি সিনেমা অবশ্য আগেও এই হলে চলত। স্ক্রিন নয় চেষ্টা করছেন দুটো স্ক্রিনে ভাগ করে দিতে। একটা কাফে করতেও উৎসাহী তাঁরা যদি কেউ তাঁদের সঙ্গে করতে রাজি হন। নতুন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে প্রস্তুত তা বোঝা যাচ্ছে।

এতে কি বদল আসবে, টিঁকে থাকতে পারবে ইন্দিরার মতো হলগুলো? আমরা দেখে এলাম রমরমিয়ে চলছে বাহুবলী দুপুরের গরমে, রাইস-এও নাকি লোকে সিটি দিয়েছে, শাহরুখ খানের মতো সেজে এসেছে, মালিকেরা হুইসিল বিতরণ করেছেন। এই দর্শক যতদিন থাকবে ততদিন আশা করতেই পারা যায় যে এমন হল টিঁকে থাকার স্বপ্ন দেখতেই পারে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *